প্রকৃতিবাংলাদেশ ভ্রমণ

ঘুরে আসুন মেঘের দেশ সাজেক ভ্যালি থেকে

সাজেক ভ্যালি মেঘের দেশ সাজেকের 14সাজেক ভ্যালি মেঘের দেশ সাজেক

সাজেক ভ্যালি মেঘের দেশ সাজেকের বর্ণনাঃ

সাজেক ভ্যালি, যেখানে মেঘ ছোঁয়া যায়। যেখানে মেঘ ও পাহাড়ের সাথে মিতালি করা যায়। ঋতুভেদে ভিন্ন ভিন্ন রূপ নিয়ে হাজির হয় আমাদের মাঝে। বিশেষ করে বর্ষা ঋতুতে অপরূপ সৌন্দর্যের দুয়ার খুলে যায়। কখনো মেঘ, কখনো বৃষ্টি, আবার কখনো রৌদ্র ছায়ার খেলা। এ যেন এক অদ্ভুত মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। চারিদিকে সবুজ আর সবুজ যেন হাত ছানি দিয়ে ডাকছে। সাজেকে রাতে বেলায় চাঁদের আলোতে ভিন্ন এক রূপ ধারন করে। আকাশ ভরা তারার মেলা, ঝিরি ঝিরি বাতাস বয়, মনের অজান্তেই চলে যাবেন এক অপার্থিব জগতে। আপনার কাছে মনে হবে পৃথিবী থেকে অনেক অনেক দূরে কারো অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন। এ এক অন্য রকম ভাললাগার অনুভূতি।

সাজেক নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে উঠে সবুজ প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্যে ঘেরা, মেঘে আচ্ছন্ন এক মেঘের রাজ্য। যেখানে দেখা মিলে সাদা তুলার ন্যায় মেঘের এক পাহাড় হতে অন্য পাহাড়ের চূড়া জয় করার নৈসর্গিক দৃশ্য। সারাবছরই সাজেকে ভ্রমণ পিপাসুদের আনাগোনা থাকে, একেক সময় একেক রকম বর্ণিল সাজে সেজে থাকে।

সাম্প্রতিক সময়ে ভ্রমণ পিপাসু মানুষদের কাছে যে কয়টি ভ্রমণ গন্তব্য সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে তার মধ্যে অন্যতম হল রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত সাজেক ভ্যালি। মুল সাজেক বলতে যে স্থানকে বুঝায় সেটি হলো ‘রুইলুই’ এবং ‘কংলাক’ নামের দুটি বসতি, স্থানীয় ভাষায় ’পাড়া’। কমলা চাষের জন্য বিখ্যাত সাজেক।

সাজেক ভ্যালি মেঘের দেশ সাজেক
সাজেক ভ্যালি মেঘের দেশ সাজেক

সাজেক ভ্যালি বাংলাদেশের রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার অন্তর্গত সাজেক ইউনিয়নের একটি বিখ্যাত পর্যটন আকর্ষণ। সাজেক ভ্যালি রাঙামাটি জেলার সর্বউত্তরের মিজোরাম সীমান্তে অবস্থিত। সাজেকের উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা, দক্ষিণে রাঙামাটির লংগদু, পূর্বে ভারতের মিজোরাম, পশ্চিমে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা অবস্থিত।

সাজেক এমন একটি জায়গা যেখানে ভাগ্য ভাল হলে ২৪ ঘণ্টায় আপনি প্রকৃতির তিনটা রূপই দেখতে পারবেন । কখনো খুবই গরম একটু পরেই হটাৎ বৃষ্টি এবং তার কিছু পরেই হয়তো চারদিকে ঢেকে যাবে কুয়াশার চাদরে । রাতে এই দুর্গম পাহাড়ের চুড়ায় যখন সোলারের কল্যাণে বাতি জ্বলে উঠে তখন সৃষ্টি হয় অসাধারণ এক পরিস্থিতি। অনেক বাচ্চারা রোড লাইটের নিচে বই নিয়ে বসে পড়ে অথবা ঐ টুকু আলোর ভিতরেই খেলায় মেতে উঠে।

সাজেক থেকে গাড়িতে কিছুদূর যাওয়া যায়। গাড়ি যাওয়ার রাস্তা শেষে হাঁটতে হয়। মূলত পাহাড় থেকে তলদেশে নামতে হবে গাছগাছালি আর জঙ্গলের মাঝের ছোট সরু পথ দিয়ে। অনেকটা পথ হাটতে হয়। পথ পিচ্ছিল আর খাড়া। নামতে তেমন কষ্ট হয় না কিন্তু উঠতে অনেক কষ্ট হয়। অবশ্যই পানি, গ্লুকোজ, স্যালাইন নিয়ে যাবেন। প্রায় ২ কিমি খাড়া পথ বেয়ে নামতে ননস্টপ ২০ মিনিটের মত নামতে হবে আর একই পথ আসতে সময় লাগবে ৩০ মিনিটের মত। প্রায় ৭০-৮০ ফুট উপর থেকে ঝর্নার পানি পরে। ঝর্নার পানি অনেক ঠান্ডা। পানিতে গোসল করে আসতে পারেন। সূর্যদয়, সূর্যাস্ত আর চাঁদ ওঠা দেখা যায়। হ্যালিপ্যাডে ব্যাম্বু টি মানে বাঁশের চা পাওয়া যায়, মূলত তেঁতুল দিয়ে তৈরি চা সাইজ করা ছোট বাঁশে পরিবেশন করা হয় বলেই ওটাকে ব্যাম্বু টি।

সাজেক ভ্যালিতে শীতকালে বেশি পর্যটক থাকে। এটিকে অন-সিজন বলে। সাধারণত এর স্থিতিকাল হয় নভেম্বর- ফেব্রূয়ারি মাস অবধি। এছাড়াও দুটি দিনে পর্যটকের সংখ্যা অন্যদিনের তুলনায় বেশি হয়। একে অন-ডে বলে। এই দুদিন হলো শুক্রবার এবং শনিবার। পূর্ব দিকের রিসোর্টগুলোতে সব থেকে সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়।

 

কিভাবে যাবেন সাজেক ভ্যালি ও খাগড়াছড়িঃ

চট্টগ্রাম টু সাজেকঃ

চট্টগ্রাম হতে -> অক্সিজন মোড় -> খাগড়াছড়ি -> খাগড়াছড়ি সদরে -> চান্দের গাড়ি -> এসকর্টে সাজেকর রাস্তা -> দীঘিনালা আর্মি ক্যাম্প -> সেখানে ১০১৫ মিনিট অপেক্ষা করে আবার রওনা -> বাঁঘাইহাট আর্মি ক্যাম্পের উদ্দেশ্য -> কাসালং ব্রীজ -> মাসালং -> টাইগার টিলা -> সাজেক ভ্যালি।

ঢাকা টূ সাজেক ভ্যালিঃ 

রাতে সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে রওনা দিয়ে ->খাগড়াছড়ির ->খাগড়াছড়ি সদরে -> চান্দের গাড়ি -> এসকর্টে সাজেকর রাস্তা -> দীঘিনালা আর্মি ক্যাম্প -> সেখানে ১০১৫ মিনিট অপেক্ষা করে আবার রওনা -> বাঁঘাইহাট আর্মি ক্যাম্পের উদ্দেশ্য -> কাসালং ব্রীজ -> মাসালং -> টাইগার টিলা -> সাজেক ভ্যালি।

যারা রাঙ্গামাটি হয়ে আসবেন সাজেকেঃ

রাঙ্গামাটি থেকে নৌপথে লঞ্চযোগে অথবা সড়কপথে বাঘাইছড়ি যাওয়া যায়। রিজার্ভ বাজার লঞ্চঘাট থেকে প্রতিদিন সকাল ৭.৩০ থেকে ১০.৩০ ঘটিকার মধ্যে লঞ্চ ছাড়ে। ভাড়া জনপ্রতি ১৫০-২৫০ টাকা। সময় লাগে ৫-৬ ঘন্টা। বাস টার্মিনাল থেকে সকাল ৭.৩০ থেকে ৮.৩০ ঘটিকার মধ্যে বাস ছাড়ে, ভাড়া জনপ্রতি ২০০ টাকা। সময় লাগে ৬-৭ ঘন্টা।

ঢাকা থেকে শান্তি পরিবহনের বাসে। সাজেক যাওয়ার জন্য খাগড়াছড়ি নামলেও হয় আবার দীঘিনালা নামলেও হয়। সব বাস খাগড়াছড়ি শহরে যায়। আর দীঘিনালা যায় শুধু ‘শান্তি পরিবহন’ ভাড়া ৫৮০ টাকা (আনুমানিক)। বাসের টিকিট অবশ্যই আগেই কেটে রাখা উচিত। ভোর ৫ টায় দিকে নামিয়ে দেয় দীঘিনালায়। অন্যান্য বাস খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছায় প্রায় একই সময়ে। বাস শাপলা চত্বরে নামায়, যেখানে চান্দের গাড়ির কাউন্টার। আর ওটাই লাস্ট স্টপেজ। আর যদি বাস শাপলা চত্ত্বর না যায় তবে ওদের কাউন্টারের সামনে নামাবে, ওখান থেকে হেটে শাপলা চত্ত্বর যেতে হবে, মাত্র ৩/৪ মিনিট এর রাস্তা। দীঘিনালা থেকে সাজেকের দুরত্ব কম। খাগড়াছড়ি শহর থেকে সাজেকের দূরত্ব ৬৫ কিমি, দিঘিনালা থেকে ৪৪ আর বাঘাইছড়ি থেকে ৩২ কিমি।

দীঘিনালাতেই শান্তি পরিবহনের টিকেট কাউন্টার আছে। আপনারা চাইলে রিটার্ন টিকেট কেটে ফেলতে পারেন। পাশেই চান্দের গাড়ির কাউন্টার থেকেই চান্দের গাড়ি রিজার্ভ করতে পারেন। চান্দের গাড়ির ড্রাইভার, হেলপারের থাকা খাওয়ার ব্যবস্হা ওদের নিজেদের। এই প্যাকেজে করে সাজেকে একরাত খাগড়াছড়ির আলুটিলা গুহা, রিচাং ঝর্না,ঝুলন্ত ব্রিজ, তারেং। এসব আগে থেকে বলে নিবেন ৷ চাঁদের গাড়িতে ১০ থেকে ১২ জন বসা যায়। মাঝে ৩ জায়গায় বিজিবি চেকপোস্টে এন্ট্রি করতে হয়। যাওয়ার পথে বাঘাইহাট নামক জায়গায় যেয়ে সব গাড়ি/সিএনজি কে বাধ্যতামূলক ভাবে দাঁড়াতে হয়, সকাল ১০.০০ এর মধ্যে যত জিপ বা সিএনজি বাঘাইহাট পৌঁছাবে সেসব গাড়িগুলোকে নিরাপত্তা জনিত কারণে সামনে ও পিছনে প্রটেকশন দিয়ে পুলিশ বা আর্মি সাজেক পর্যন্ত পৌঁছায় দেয়। ঠিক ১২.১৫ তে সাজেকে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে দুটো এস্কর্টে গাড়ি সাজেক ঢুকে। প্রথমটা সকাল ১০টায়। দ্বিতীয় টা বিকেল ৩টায়। সাজেকে প্রবেশ মূল্য জনপ্রতি ২০/= ও গাড়ি রাখার ভাড়া ১০০/=

 

কখন যাবেন সাজেক ভ্যালি ও খাগড়াছড়িঃ

শুধুই ঘুরাঘুরির জন্য হলে শীতকাল যাওয়া সবচেয়ে ভালো। আর আপনি যদি এডভেঞ্চার প্রিয় হন আর পাহাড়ের সত্যিকারের সৌন্দর্য দেখতে চান তবে বর্ষাকালে আসুন।

 

সাজেকে ও খাগড়াছড়ি ভ্রমণের বর্ণনাঃ

খুব ভোরে আপনাকে উঠতে হবে নাহলে সাজেক থেকে সূর্যোদয় দেখার মত সুন্দর মূহুর্তটি মিস করবেন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যটি বিশেষত যখন ছড়িয়ে পড়বে আপনি দেখবেন যে মেঘ, আপনার শরীরকে স্পর্শ করছে তখন আপনি অনুভব করবেন যে আপনি স্বর্গে বাস করছেন। হ্যালিপ্যাড থেকে ভালোভাবে সূর্যাস্ত দেখতে পারবেন। সন্ধ্যার পর বসে বসে আড্ডা দিতে পারবেন হ্যালিপ্যাডে। আড্ডা দিতে দিতে উপভোগ করতে পারবেন সাজেকের রাতের সৌন্দর্য। আকাশে প্রচুর তারা। চাদের আলোতে মেঘের সৌন্দর্য। মনে হয় একটা নদী এঁকেবেঁকে চলে গেছে। এই সৌন্দর্য শুধু অনুভব করা যায়। ছবিতে ধারণ করা যায় না। ভোর বেলা উঠে প্ল্যান করে হ্যালিপ্যাডে গয়ে কিংবা কংলাক পাহাডে গিয়ে সূর্যোদয় দেখবেন। এটা না দেখলে খুব মিস করবেন।

কমলার সিজনে কমলা খেতে ভুলবেন না। সাজেকের কমলা বাংলাদেশের সেরা কমলা। বাংলাদেশ আর্মিদের দারা রুইলুই পারার অধিবাসীদের জন্য একটা ছোট তাত শিল্প গরে তোলা হয়েছে। সুন্দর সুন্দর গামছা ,লুঙ্গী পাওয়া এখানে।

সাজেকে কংলাক পাহাড়ঃ

কংলাক পাহাড় সাজেকের সবথেকে উঁচু পাহাড়ের চূড়া। কংলাকে যাওয়ার জন্য যত আগে আগে রওনা হওয়া যায় ততই ভাল, তাতে পাহাড় ট্রেকিংয়ের কষ্ট কম হয়। কটেজের সামনে থেকে গাড়িতে উঠে যতদূর পর্যন্ত গাড়ি যেতে পারে ততদূর পর্যন্ত যেয়ে তারপর হাঁটা পথ। হেঁটে ২০ মিনিটে পৌঁছানো যায় কংলাকের চূড়ায়। পাহাড়ের চূড়া থেকে সবচেয়ে সুন্দর ভিঊ দেখা যায়। পাহাড়ে মেঘ দেখতে দেখতে চা খাওয়ার ফীলটা অসাধারণ। উপর থেকে আকাশ ও মেঘের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।

সাজেক যাওয়ার পথে দিঘীনালা থেকে ৮ কি.মি. দূরে দিঘীনালা-সাজেক রোডের পাশেই হাজাছড়া ঝর্ণা দেখে নিতে পারেন, মূল সড়ক থেকে ১০-১৫ মিনিট হাটলেই দেখা পেয়ে যাবেন এই অপূর্ব ঝর্ণাটির।

তৈদুছড়া নামে আরো একটি অসাধারণ ঝর্না রয়েছে দিঘীনালায়, তবে এটি দেখতে হলে আপনাকে আলাদা করে একদিন সময় রাখতে হবে শুধু এই ঝর্ণাটির জন্য। দিঘীনালার জামতলি থেকে হেঁটে এই ঝর্ণায় জেতে আসতে সময় লাগবে প্রায় ৬-৭ঘন্টা। দিঘীনালা বাস স্টেশন থেকে ইজিবাইকে জামতলি যেতে পারবেন, ভাড়া প্রতিজন ১০টাকা। এই ঝর্ণায় যাওয়ার সময় অবশ্যই সাথে পর্যাপ্ত শুকনো খাবার নিয়ে যাবেন সাথে, কারন জামতলির পরে আর কোন দোকান নেই। তৈদুছড়া ঝর্ণায় জেতে হলে স্থানীয় অথবা পথ চেনে এমন কাউকে সাথে নিতে হবে।

দিঘীনালা-সাজেক রোডের নন্দরামে নেমে যেতে হবে সিজুক ১ এবং ২ ঝর্ণায়, পায়ে হেটে আসা যাওয়ায় সময় লাগবে ৬-৮ ঘন্টা, সাথে খাবার এবং গাইড নিয়ে যেতে হবে অবশ্যই। সাজেক নামে আলাদা করে কোন বাজার বা এমন কিছু নেই। রুইলুই পাড়াতেই সব রিসোর্ট এবং দোকান। সাজেকের সৌন্দর্য উপভোগ করা হয় রুইলুই পাড়া এবং কংলাক পাড়া থেকে। কংলাকে মূলত লুসাইদের বসবাস, ইদানিং কিছু ত্রিপুরা পরিবার সেখানে বসবাস করছে। সাজেকের সকালটা একরকম সুন্দর, বিকেলটা আবার অন্যরকম, রাতে চাঁদের আলোয় যদি সাজেকের সুনসান রাস্তায় হাঁটা না হয় তবে সাজেক ভ্রমনই বৃথা! সাজেকের সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে অন্তত এক দুইদিন থাকতেই হবে। সাজেক যাওয়ার ভালো সময় বর্ষা এবং শীত।বর্ষার টুপটাপ বৃষ্টি, হাতের কাছে নেমে আসা মেঘ আর চারদিকের সবুজ মিলিয়ে সাজেক যেন পাহাড়ের রানী হয়ে উঠে। শীতের কুয়াশাঢাকা সাজেক আবার আলাদা রকম সুন্দর।

 

খাগড়াছড়ি ভ্রমণের জায়গাঃ

প্রথমে রিসাং ঝর্না, তারপর তারেং, তারপর আলুটিলা আর যদি সময় থাকে তো জেলা পরিষদ পার্ক ঝুলন্ত ব্রিজ।

খাগড়াছড়িতে রিচাং ঝরণাঃ

গাড়ি থেকে নেমে ১.৫ কিলো হাঁটতে হয়। সাথে ২৩৪ টা সিড়ি। ঝর্নাটা সুন্দর। এখানে স্লাইড করা যায়। স্লাইড অনেক মজার কিন্তু একটু রিস্ক। এরপর তারেং।

খাগড়াছড়িতে তারেং:  

তারেং মূলত সাজেকে যেটাকে হ্যালিপ্যাড বলে সেটাই এখানে তারেং নামে পরিচিত। হেলিকপ্টার নামতে পারে আর মূলত পাহাড়ের অনেক উঁচুতে হওয়ায় দূরের সব পাহাড়ের চূড়া আর ছোট নদীটা দেখা যায়।

খাগড়াছড়িতে আলুটিলা গুহাঃ

প্রতিজন ২০ টাকা আর গাড়ির জন্য ৫০ টাকা টিকিট লাগে আলুটিলা এরিয়াতে ঢুকতে। খাগড়াছড়ি শহরটা একনজরে দেখা যায় এই আলুটিলা এরিয়া থেকে। আগে মশাল নিয়ে গুহায় যাওয়ার অনুমতি থাকলেও এখন সেটা নিষেধ করেছে কর্তৃপক্ষ। ১০০ মিটার লম্বা গুহাটার ভিতরে ভীষণ ঠান্ডা। পায়ের নীচে হালকা পানির ফ্লো। আর ভীষণ অন্ধকার। গুহার সব যায়গায় সমান চওড়া না। সব মিলিয়ে দারুণ একটা এডভেঞ্চার।

সাজেক ভ্যালি মেঘের দেশ সাজেক
সাজেক ভ্যালি মেঘের দেশ সাজেক

খাগড়াছড়িতে ঝুলন্ত ব্রিজ:

তারপর ঐখান চলে গেলাম খাগড়াছড়ি পার্কে। এখানেই ঝুলন্ত ব্রিজ জেলা পরিষদ পার্ক।

সাজেক ভ্যালি মেঘের দেশ সাজেক
সাজেক ভ্যালি মেঘের দেশ সাজেক

এখানে রাস্তায় পাহাড়ি ফলের দোকান। অনেক টাইপের ফল খেতে পারবেন।

যা যা দেখার আছে: হাজাঝরা ঝর্ণা, সাজেক (আর্মি ক্যাম্প-ছবি তোলা নিষেধ, রুইলুই পাড়া, রুনময় পাড়া, সুইজারল্যান্ড পাড়া, হ্যালিপ্যাড, কংলাক পাড়া, আলুটিলা গুহা, তারেং, ঝুলন্ত ব্রিজ, খাগড়াছরি শহর)

সাজেকে হোটেলে নামঃ

১. মনটানা
২. পেদা টিং টিং
৩. সাজেক চিলেকোঠা সহ আরো অনেক হোটেল।

৪. হিমালয় হোটেল।
সব হোটেলের খাবারের মেন্যু এবং দাম প্রায় একই।
বিঃদ্রঃ রুই মাছ এবং মাংস খেতে চাইলে অবশ্যই ১দিন আগে থেকে বুকিং দিতে হবে। খাবার অর্ডার করার ১ ঘন্টা পর পাবেন। তাই গিয়ে তাড়াতাড়ি অর্ডার করে দেয়া ভালো।

সাধারণ রিসোর্ট এর ভাড়া ১৫০০-২০০০ এর মধ্যে(শুক্র,শনি ও ছুটির দিনগুলোতে ভাড়া ২৫০০-৩০০০)। বেস্ট ভিউ রিসোর্ট গুলো ৩০০০-৪৫০০ টাকা ভাড়া নেবে। আগে থেকে বুকিং দিয়ে যাওয়া ভাল। বারটার মধ্যে রিসোর্ট চেকআউট করবার নিয়ম।

হিমালয় হোটেল। হোটেলটা ভালই৷ প্রতিরুমে ৪ জন করে। দুইটা বেড প্রতিরুমে। ৫ জন অনায়াসে থাকা যায়। শুক্র শনি গেলে অবশ্যই হোটেল বুক দিয়ে যাবেন।

 

সাজেকে খাবারের দোকানগুলো প্যাকেজ সিস্টেম যেমনঃ

১. ভাত+ডাল+আলুভর্তা+সবজি+দেশি মুরগী দাম ১৮০/=
২. ভাত+ডাল+আলুভর্তা+সবজি+ফার্মের মুরগী দাম ১৪০/=
৩.ভাত+ডাল+আলুভর্তা+ সবজি দাম ১২০/=

ব্যাম্বো-চিকেন খাবেন। সেটার অর্ডার দিবেন আগের থেকে। ব্যাম্বো চিকেন হচ্ছে পাহাড়িদের জনপ্রিয় একটি খাবার। একটা বাশের ভিতর মুরগীর মাংস, মশলা, মরিচ একসাথে দিয়ে আগুনে পুরিয়ে রান্না করা হয়। এখানে সাধারণত রাতে সবাই দুইটা খাবার খায়। ব্যাম্বো চিকেন অর BBQ. ওরা একেক দোকান একেক দাম চাইবে।

 

সাজেক ভ্যালি ভ্রমণে ব্যাগে যা যা নিতে হবেঃ

শার্ট, প্যান্ট, টি শার্ট বা পরিধেয় কাপড় প্রয়োজনমত, গামছা, মান্টিপ্লাগ বা থ্রি পিন, পাওয়ার ব্যাংক, ফোন চার্জার, ব্রাশ-পেস্ট, পলিথিন, সানগ্লাস, নিক্যাব বা এংলেট (যদি লাগে), ছাতা, প্রসাধনী( বডি স্প্রে, ফেসওয়াশ, চিরুনি), ক্যাপ, হেডফোন, মোবাইল, মোবাইল রিচার্জ, সাবান, স্যালাইন, গ্লুকোজ, শীতের সময় গেলে শীতের কাপড়, প্রয়োজনীয় ঔষধ- নাপা, এলাট্রল, স্যাভলন, অমিডন, মুভ, টর্চলাইট (আলুটিলা গুহার জন্য), স্যান্ডেল।

 

সাজেক ভ্রমণে সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ

১. অত্যাধিক মাত্রায় সাহস আর মনের ইচ্ছা না থাকলে কোন পুরুষ+নারী চান্দের গাড়ির ছাদে ভুলেও উঠবেন না। উঠবেন না মানে না। আর্মি গাড়ি থামায়ে অবজেকশন দিলে সাথে সাথে নেমে যাবেন আর ২য় বার উঠবেন না। আর আর্মি ক্যাম্পের ৫০ গজ আগেই ছাদ থেকে নামবেন। নিজের আনন্দের জন্য ড্রাইভারকে বিপদে ফেলবেন না।

২. যারা গাড়িতে বমি করে, উচ্চতায় বমি করে, হালকা ভুমিকম্পেও যাদের মাথা ঘুরায় আর প্রচন্ড ব্যাকপেইন আছে ভুলেও এ ট্রিপ করবেন না। আর কোমরে পেইন আলা রোগীরা গেলেও বেল্ট পড়ে নিবেন। এছাড়া মুভ স্প্রে নিবেন। ৫ বছরের নিচে বাচ্চা না নেওয়াই ভালো।

৩. আর লেডিস যারা আছেন তারা ঝুলানো লং ড্রেস আর ওড়না নেওয়াটা এভয়েড করে পেচায় নিবেন বা বেধে নিবেন। নাহয় পাহাড়ে উঠতে গেলে বা হাটা হাটিতে ওড়নায় পা বেঝে ডাইরেক্ট গিরিখাতে পড়বেন নাহয় আছাড় খাবেন। সবচেয়ে ভালো হয় জিনস/টিশার্ট বা ফতুয়া। ওড়না সামলায়ে যেটাতে যে কম্ফোর্টেবল তাই পড়বেন।

৪. সাজেক দুটো স্কট ছাড়া যাওয়া যায়না, ১ম টি- ১০টায়, ২য় টি- ৩টায়।
৫. পানি নিয়ে যাবেন খাগড়াছড়ি থেকে, সাজেকে পানির দাম বেশি।

৬. দয়া করে কেউ পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কোন কাজ করবো না, পাহাড়ি আদিবাসীদেরর শ্রদ্ধা করবেন।

৭. এসব রিসোর্টে বলতে গেলে তেমন কিছুই নেই। তাই প্রয়োজনীয় সবকিছু ঢাকা থেকে নিয়ে যেতে হবে। যেমন-ব্রাশ-পেস্ট, মিনিপ্যাক শ্যাম্পু, সাবান, টাওয়াল। সাজেকে কারেন্ট সাপ্লাই নেই। সবকিছু সোলার বিদ্যুৎ এ চলে। তাই দিনে হয়তো একবার এবং সন্ধ্যা থেকে রাত সাড়ে ১০ টা পর্যন্ত একবার পাওয়ার সাপ্লাই দেয়া হয়।

৮. যারা রাতে খাগড়াছড়ি থাকতে চান তারা অবশ্যই হোটেল আগে থেকে বুকিং দিয়ে যাবেন। ১০টার মধ্যে সব হোটেল/ রিসোর্ট বন্ধ হয়ে যায়। আগে থেকে বুকিং থাকলে কোন সমস্যা হয়না।

৯. খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক যাওয়ার সময় পাহাড়ের বেস্ট ভিউ পাওয়া যায় চান্দের গাড়ির উপরে/ছাদে বসে। না বসলে আসলেই অনেক কিছু মিস হবে। (বাঘাইছড়ির পর থেকে আর জীপের উপরে বসা যাবে না কারণ সাথে আর্মির গাড়িও থাকবে)।
১০. কংলাক পাহাড়ে উঠার সময় ছোট বাঁশ সাথে নিতে হবে তাতে পাহাড় ট্রেকিং এ সুবিধা হয় ইভেন ওটা ঝরণায় যাওয়ার সময়ও কাজে লাগবে। কংলাকে উঠার পথেই বাঁশ কিনতে পাওয়া যায়।
১১. ঝরণায় যাওয়ার সময় গাইড লাগে না, একটু খোঁজ খবর নিয়ে নিজেরাই যাওয়া যায়।
১২. ঝরণায় যাওয়ার সময় ট্রেকিং করা শক্ত গ্রীপের জুতা পড়ে যাওয়া ভাল আর সাথে বাধ্যতামূলক ভাবে পানির বোতল রাখতে হবে সবাইকে। সাথে পলিথিনও।

১৩. সাজেক থেকে ব্যাক করে রিচাং ঝর্ণা সহ আলুটিলা গুহা, তারেং, ঝুলন্ত ব্রিজ এগুলোই যাইতে চাইলে অবশ্যই তাড়াতাড়ি বের হতে হবে, অন্যথায় সবকিছু দেখে শেষ করা যাবে না।
১৪. শুধু রবি আর এয়ারটেল নেটওয়ার্ক থাকে, জিপিতে ও বাংলালিংকে নেটওয়ার্ক থাকেই না।

*** আর্মি ক্যাম্প-ছবি তোলা নিষেধ

 

সাজেক ভ্যালি ভ্রমণে খরচসমূহঃ

★ সবুজ জীপ বা চান্দের গাড়ি ৮১০০/১০= ৮১০
★ সাজেক প্রবেশ জনপ্রতি = ২০
★ গাড়ি পাকিং ১০০/১০ = ১০
★রুম ভাড়া +এক রুমে ৪ জন ৩০০০/৪ = ৭৫০
★ খাগড়াছড়ির রুম ভাড়া জন (৩ বেড)= ১৪০০÷৭= ২০০
★ সকালের নাস্তা,দুপুরের খাবার,সন্ধ্যার নাস্তা ৫০০ টাকা।

পদটিকাঃ ছবির মত সুন্দর শহর সাজেক। যেখানে সেখানে ট্যিসু বা ময়লা ফেলবেন না। প্লাস্টিকের বোতল যেখানে সেখানে ফেলবেন না। আমরা নিজে থেকে সচেতন হই। অন্যজন ময়লা ফেললেই আমি ফেলবো কেন? আসুন আমরা নিজে সচেতন হই। অন্যকে সচেতন করি। যেখানে সেখানে নিজেদের নাম ফোন নাম্বার এগুলা লিখা থেকে বিরত থাকি। আলুটিলা গুহার সিড়িতে দেখলাম অনেকে নাম লিখে রেখেছে যেটা মোটেও ঠিক নয়। আসুন আমরা নিজে সচেতন হই। অন্যকে সচেতন করি।
ধন্যবাদ।

 

 

1

Leave a Reply

%d bloggers like this: