অন্যান্য ইতিহাসজীব বিজ্ঞানস্বাস্থ্য

করোনা ভাইরাস ও অন্যান্য মহামারির ইতিহাস

করোনা ভাইরাস aloasbei.comকরোনা ভাইরাস aloasbei.com

করোনা ভাইরাস

বা কোভিড-১৯, যা নভেল করোনা ভাইরাস নামে পরিচিত – সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমের প্রতিদিনের শিরোনামে প্রাধান্য বিস্তার করেছে। প্রায় জনবসতিহীন এন্টার্ক্টিকা মহাদেশ ব্যতীত সারা পৃথিবীর জুড়ে যার বিস্তার ঘটেছে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিটি দেশের প্রায় প্রতিটি লোকালয়ে। ইতোমধ্যে কেড়ে নিয়েছে ২ লক্ষ ৭৫ হাজারেরও অধিক প্রাণ।

ভাইরাস কী?

(Virus) হল একপ্রকার অতি-আণুবীক্ষণিক এবং অকোষীয় জৈব কণা বা অণুজীব যারা জীবিত কোষের ভিতরেই একমাত্র বংশবৃদ্ধি করতে পারে। ভাইরাস মানুষ,পশু-পাখি, উদ্ভিদের বিভিন্ন রোগের জন্য। ভাইরাস ল্যাটিন ভাষা হতে গৃহীত একটি শব্দ যার অর্থ হল বিষ। আদিকালে রোগ সৃষ্টিকারী যে কোন বিষাক্ত পদার্থকে ভাইরাস বলা হত। ভাইরাস কে জীবাণু না বলে ‘বস্তু’ বলা হয়। কারণ, জীবদেহে নিউক্লিয়াস ও সাইটোপ্লাজম থাকলেও ভাইরাসের তা নেই; কেবল প্রোটিন এবং নিউক্লিক এসিড দিয়ে এদের দেহ গঠিত। কেবলমাত্র উপযুক্ত পোষকদেহের অভ্যন্তরে বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এদের অভ্যন্তরীণ তথ্য বহনকারী সূত্রক দুই প্রকারের হতে পারে: ডিএনএ এবং আরএনএ।

করোনা ভাইরাস কী?

করোনাভাইরাস বলতে ভাইরাসের একটি শ্রেণিকে বোঝায় যেগুলি স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখিদেরকে আক্রান্ত করে। মানুষের মধ্যে করোনাভাইরাস শ্বাসনালীর সংক্রমণ ঘটায়। এই সংক্রমণের লক্ষণ মৃদু হতে পারে, অনেকসময় যা সাধারণ সর্দিকাশির ন্যায় মনে হয় (এছাড়া অন্য কিছুও হতে পারে, যেমন রাইনোভাইরাস), কিছু ক্ষেত্রে তা অন্যান্য মারাত্মক ভাইরাসের জন্য হয়ে থাকে, যেমন: সার্স, মার্স এবং কোভিড-১৯।

করোনা ভাইরাসের ইতিহাস

করোনা ভাইরাস ১৯৬০-এর দশকে প্রথম আবিষ্কৃত হয়। প্রথমদিকে মুরগির মধ্যে সংক্রামক ব্রঙ্কাইটিস ভাইরাস হিসেবে এটি প্রথম দেখা যায়। পরে সাধারণ সর্দি-হাঁচি-কাশিতে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে এরকম দুই ধরনের ভাইরাস পাওয়া যায়। মানুষের মধ্যে পাওয়া ভাইরাস দুটি ‘মনুষ্য করোনা ভাইরাস ২২৯ই’ এবং ‘মনুষ্য করোনা ভাইরাস ওসি৪৩’ নামে নামকরণ করা হয়। তবে অনেকের সন্দেহ যে এই ভাইরাসটি চীন সরকার তার দেশের গরিব জনগনকে শেষ করে দেওয়ার জন্য নিজেরাই তৈরি করে নিজেরাই ছড়িয়ে ছিলো।[৪] এরপর থেকে বিভিন্ন সময় ভাইরাসটির আরো বেশ কিছু প্রজাতি পাওয়া যায় যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ২০০৩ সালে ‘এসএআরএস-সিওভি’, ২০০৪ সালে ‘এইচসিওভি এনএল৬৩’, ২০০৫ সালে ‘এইচকেইউ১’, ২০১২ সালে ‘এমইআরএস-সিওভি’ এবং সর্বশেষ ২০১৯ সালে চীনে এসএআরএস-সিওভি-২’ পাওয়া যায় (যা বর্তমানে সাধারণত নোভেল করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ নামেই পরিচিত। এগুলোর মধ্যে অধিকাংশ ভাইরাসের ফলে শ্বাসকষ্টের গুরুতর সংক্রমণ দেখা দেয়।

নভেল করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ এর নামকরণ

করোনা ভাইরাসের অনেক রকম প্রজাতি আছে, কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৭টি মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারে। “নভেল” শব্দের অর্থ “পূর্বের পরিচিত প্যাথোজেনের নতুন সদস্য” (অর্থাৎ পরিচিত ভাইরাস গোত্রের নতুন সদস্য) । এই করোনাভাইরাসটি ইতঃপূর্বে মানুষের মধ্যে পাওয়া যায় নি বলেই এর এরূপ নামকরণ।

যেভাবে মহামারী হয়ে ওঠে করোনা ভাইরাস

২০১৯-এর শেষপ্রান্তে যখন চীনে কোভিড ১৯-এর সূচনা ঘটে । শুরুতে চীনের উহানে যখন অজ্ঞাতনামা হিসেবে এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটে, মানবদেহে সংক্রমিত হয়ে শ্বাসকষ্টসহ নানা উপসর্গের মাধ্যমে প্রাণ কেড়ে নিতে থাকে, তখন এতটা ভয় ছিল না করোনা নিয়ে। পরবর্তী সময়ে এটি যখন প্রাণসংহারী রুদ্র রূপ ধারণ করে, তখন সাধারণ মানুষ তো বটেই, চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ, গবেষক—সবারই টনক নড়ে।

করোনা ভাইরাস উহানের গণ্ডি পেরিয়ে গোটা চীন, সে দেশের সীমানা পেরিয়ে নানা দেশে ছড়াতে সময় লাগেনি। ‘প্যানডেমিক’ শব্দটা তখন গায়ে লেগে যায় করোনার। তবে তা আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা ছিল না। ছিল মুখে মুখে। বলা হচ্ছিল যে এই ভাইরাসের সংক্রমণে দেখা দেওয়া কোভিড-১৯ রোগটি মহামারি আকারে দেখা দিচ্ছে। ততক্ষণে শতাধিক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে করোনা ভাইরাস। এরপর করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকে ১২ মার্চ, ২০২০ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রধান ড. টেড্রস অ্যাডহানম গেব্রেইয়েসুস এক সংবাদ সম্মেলনে একে বৈশ্বিক মহামারি (Pandemic) ঘোষণা দেন।

প্রাদুর্ভাব, মহামারি এবং বৈশ্বিক মহামারির মধ্যে এর পার্থক্য

সারা বিশ্বের সব দেশেই মানুষ অসুস্থ্য হন, অসুস্থ্য হয়ে ডাক্তারের কাছে যান এবং চিকিৎসা নেন। এটা খুবই স্বাভাবিক একটি ঘটনা। তবে স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চ মাত্রায় যদি কোনো রোগ ছড়িয়ে পড়ে তবে সেটি এপিডেমাইওলজিস্টদের (মহামারি বিদ্যা-সংক্রান্ত চিকিৎসক) মতে ‘প্রাদুর্ভাব’ এর পর্যায়ে চলে যায়।

একটি উদাহরণস্বরুপ ধরা যাক, কোনো ডে-কেয়ার সেন্টারে সপ্তাহে দুজন শিশু ডায়ারিয়ায় আক্রান্ত হয়। এটিকে স্বাভাবিক একটি ঘটনা হিসেবেই ডাক্তাররা বিবেচনা করেন। তবে সপ্তাহের ব্যবধানে আক্রান্তের সংখ্যাটি যদি ১৫ জনে পৌঁছায় তখন আর সেটি স্বাভাবিক থাকে না। সেটি ‘প্রাদুর্ভাব’ হয়ে যায়। তখন বলা হয়, ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

ইংরেজি ‘প্যানডেমিক’ বলতে যেমন মহামারি বোঝায়, তেমনি ‘এপিডেমিক’ (Epidemic) বলতেও মহামারি বোঝায়। বরং আমাদের এই দক্ষিণ এশিয়ায় মহামারি হিসেবে ‘এপিডেমিক’ শব্দটিই বেশি পরিচিত। তবে এই দুই মহামারির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। অর্থাৎ, প্যানডামিক আর এপিডেমিক এক নয়।

একসময় বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ বিশ্বের অনেক দেশেই কলেরা, গুটিবসন্ত, প্লেগের মতো প্রাণঘাতী রোগের সংক্রমণ ব্যাপক আকারে দেখা দিত। কলেরা, বসন্ত, প্লেগ দেখা দিত নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক এলাকায়। নির্দিষ্ট এক বা একাধিক গ্রাম বা অঞ্চলে। এর গণ্ডি ছিল একটা দেশের মধ্যেই। তাই এগুলো মহামারি হিসেবে এপিডেমিক।

করোনা ভাইরাস এর সঙ্গে উল্লিখিত রোগের ভাইরাসের পার্থক্য সুস্পষ্ট। করোনা নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চল বা দেশে আটকে নেই। ২১২ টি দেশ ও অঞ্চলে করোনা শনাক্ত হওয়ার রিপোর্ট পাওয়া গেছে! ০৮ মে, ২০২০ পর্যন্ত বিশ্বে প্রায় ৩৯ লাখ ১৪ হাজারের মতো মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২ লক্ষ ৭০ হাজার ৪২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে করোনার কারণে। (সূত্র: worldometer) এসব কারণে কলেরা-বসন্তের ভাইরাসের চেয়ে করোনার ভয়াবহতা আলাদা। এর বিস্তৃতি প্রায় বিশ্বজুড়ে। তাই এটা মহামারি হিসেবে ‘প্যানডেমিক’।

 

কতটা ভয়ংকর এই ভাইরাস?

শ্বাসতন্ত্রের অন্যান্য অসুস্থতার মতো এই ভাইরাসের ক্ষেত্রেও সর্দি, কাশি, গলা ব্যথা এবং জ্বরসহ হালকা লক্ষণ দেখা দিতে পারে । কিছু মানুষের জন্য এই ভাইরাসের সংক্রমণ মারাত্মক হতে পারে। এর ফলে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং অর্গান বিপর্যয়ের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। তবে খুব কম ক্ষেত্রেই এই রোগ মারাত্মক হয়। এই ভাইরাস সংক্রমণের ফলে বয়স্ক ও আগে থেকে অসুস্থ ব্যক্তিদের মারাত্মকভাবে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

কোভিড-১৯ ভাইরাস কীভাবে ছড়ায়?

সংক্রমিত ব্যক্তির শ্বাসতন্ত্রের ফোঁটার (কাশি এবং হাঁচির মাধ্যমে তৈরী) সাথে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে এবং এই ভাইরাস দ্বারা দূষিত অংশ স্পর্শ করার মাধ্যমে এটি সংক্রমিত হয়। কোভিড-১৯ ভাইরাস বেশ কয়েক ঘন্টা ভূপৃষ্ঠে বেঁচে থাকতে পারে।

করোনা আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ সমূহ

জ্বর, গলাব্যথা, কাশি, শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যাই মূলত প্রধান লক্ষণ। এটি ফুসফুসে আক্রমণ করে। সাধারণত শুষ্ক কাশি ও জ্বরের মাধ্যমেই শুরু হয় উপসর্গ, পরে শ্বাস প্রশ্বাসে সমস্যা দেখা দেয়। সাধারণত রোগের উপসর্গগুলো প্রকাশ পেতে গড়ে পাঁচ দিন সময় নেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ভাইরাসটির ইনকিউবেশন পিরিয়ড ১৪দিন পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। তবে কিছু কিছু গবেষকের মতে এর স্থায়িত্ব ২৪দিন পর্যন্ত থাকতে পারে।
মানুষের মধ্যে যখন ভাইরাসের উপসর্গ দেখা দেবে তখন বেশি মানুষকে সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকবে তাদের। তবে এমনও হচ্ছে যে নিজেরা অসুস্থ না থাকার সময়ও সুস্থ মানুষের দেহে ভাইরাস সংক্রমিত করতে পারে মানুষ। এছাড়াও পরীক্ষায় আক্রান্ত ধরা পড়া রোগীদের উপসর্গহীনও পাওয়া যাচ্ছে।

করোনা সন্দেহ বা আক্রান্ত হলে করণীয়

যাঁদের করোনা হয়েছে নিশ্চিত বা যাঁদের হয়েছে বলে সন্দেহ, ঘরে কীভাবে তাঁদের খেয়াল রাখবেন পরিচর্যাকারী বা কেয়ার গিভাররা, সে বিষয়ে কিছু পরামর্শ থাকছে এখানে।
● দেখতে হবে আক্রান্ত ব্যক্তি যাতে যথেষ্ট বিশ্রাম পান, পুষ্টিকর খাবার খান, প্রচুর পানি আর তরল পান করেন।
● একই ঘরে যখন সেবা কাজে, তখন মেডিকেল মাস্ক পরবেন দুজনে। হাত দিয়ে মাস্ক ধরবেন না। মুখে হাত দেবেন না। কাজ শেষে মাস্ক ফেলে দেবেন ময়লার ঝুড়িতে।
● বারবার হাত ধোবেন সাবান পানি দিয়ে বা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত জীবাণুমুক্ত করবেন: অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শে বা এর চারপাশের সংস্পর্শে এলে খাবার তৈরির আগে, খাবার খেতে বসার আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পর।
● অসুস্থ মানুষের জন্য আলাদা বাসনপত্র, তোয়ালে, বিছানার চাদর—এসব জিনিস সাবান দিয়ে ধুতে হবে। অসুস্থ ব্যক্তি যা যা হাত দিয়ে স্পর্শ করবেন, সেগুলো বারবার জীবাণু শোধন করতে হবে।
● অসুস্থ ব্যক্তির অবস্থা শোচনীয় হলে বা শ্বাসকষ্ট হলে স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রে ফোন করতে হবে।

মহামারির ইতিহাস

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ পর্যন্ত মাত্র দুটি রোগকে বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ১৯১৮ সালে ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং ২০০৯ সালে ইনফ্লুয়েঞ্জা এইচ-১ এন-১ কে বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

১। এথেন্সের প্লেগ (Plague of Athens): খ্রিস্টপূর্ব ৪৩০

প্রাচীন এথেন্স ও স্পার্টার মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুদিন পরই এথেন্স এক মহামারির কবলে পড়ে। এটা আনুমানিক খৃষ্টপূর্ব ৪৩০ বছর আগের কথা। এথেন্সের নিকটবর্তী বন্দর নগরী পিরাইয়ুস ছিল খাদ্য এবং অন্যান্য রসদ আনার একমাত্র পথ। এই পথেই প্লেগের আগমন ঘটেছিলো বলে বিশ্বাস করা হয়। ঐতিহাসিকের মতে, এই মারণব্যাধি ইথিওপিয়া থেকে মিসর ও লিবিয়া হয়ে গ্রীসে প্রবেশ করে এবং বিস্তৃত ভূমধ্যসাগর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

সম্পূর্ণ নতুন এই রোগ সম্পর্কে চিকিৎসকদেরও কোনো ধারণা ছিল না। ফলে রোগীর দ্বারা সংক্রমিত হয়ে অনেক চিকিৎসক মৃত্যুবরণ করেন। ঘনবসতিপূর্ণ এথেন্সের প্রায় ২৫ ভাগ অধিবাসী আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এথেন্সের নেতা, বীর পেরিক্লিসও এই প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। চারিদিকে কেবলই দাহকার্যের আগুন চোখে পড়ায় রোগাক্রান্ত শত্রুর সংস্পর্শের ঝুঁকি থেকে বাঁচার জন্য স্পার্টানরা কিছুকাল নিজেদেরকে যুদ্ধ থেকে প্রত্যা

হার করে রাখে। প্রায় ৫ বছর স্থায়ী এই মহামারিতে আনুমানিক ৭৫০০০ থেকে ১ লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিলো।
এই মহামারির লক্ষণ ছিল – আকস্মিকভাবে মাথা অত্যন্ত গরম হয়ে যাওয়া, চোখ রক্তবর্ণ হওয়া এবং প্রচ- জ্বালা করতে থাকা। এছাড়া, শরীরের ভেতরদিকের কিছু অংশে, যেমন গলার ভেতর বা জিহ্বা রক্তবর্ণ হওয়া এবং অস্বাভাবিক ও দুর্গন্ধময় শ্বাস-প্রশ্বাস হতে থাকা। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে এই মহামারি নিয়ে গবেষণা করছেন। এর পেছনে অনেক অসুখের সমন্বিত আক্রমণ থাকতে পারে-এমন ধারণা আছে- যার মধ্যে বিশেষ করে টাইফয়েড এবং ইবোলাও (Ebola) আছে।

২। আন্তোনাইন প্লেগ (Antonine Plague): ১৬৫-১৮০ খ্রিস্টাব্দ

সৈনিকরা পশ্চিম-এশিয়া, তুরস্ক, মিশর অঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে রোম সাম্রাজ্যে এই মহামারিটি বহন করে এনেছিলো বলে ধারণা করা হয়। গ্রীক চিকিৎসক গ্যালেন তখন রোমে বাস করছিলেন এবং তিনিই এটার বিবরণ দিয়েছিলেন বলে তার নামেও এই মহামারি ‘প্লেগ অব গ্যালেন’ হিসেবে চিহ্নিত। যদিও প্রকৃত তথ্য এখনো অনাবিষ্কৃত বলেই ধরে নেয়া হয়, তবু গবেষকরা একে জলবন্ত বা হাম বলেও অনুমান করেন। মনে করা হয় যে, রোমান সম্রাট লুসিয়াস ভেরু ১৬৯ খৃষ্টাব্দে এই রোগে মারা যাওয়ার ৯ বছর পর এই মহামারি পুনরায় দেখা দেয়। তখন রোমে একদিনে সর্বোচ্চ ২ হাজার পর্যন্ত মানুষ মারা গিয়েছিল। সব মিলিয়ে এই মহামারি প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নেয় বলে অনুমান করা হয়। কোনো কোনো এলাকার প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ মারা যায়। রোম সাম্রাজ্য যখন ক্ষমতার তুঙ্গে এই মহামারিটি তখন ঘটে। এতে রোমান সৈন্যবাহিনী ব্যাপকভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিলো।

৩। সাইপ্রিয়ানের প্লেগ (Plague of Cyprian): ২৫০-২৭১ খ্রিস্টাব্দ

মোটামুটি ২৪৯ থেকে ২৬২ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত এই মহামারিকালে রোমান সাম্রাজ্য একেবারে ভেঙ্গে পড়েছিলো। ধারণা করা হয় যে, এই প্লেগে মৃত্যুর ফলে খাদ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জনবলের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছিলো। তিউনিসিয়ার কার্থেজ নগরীর বিশপ সেইন্ট সাইপ্রিয়ানের নামে এই মহামারির নামকরণ হয়েছে ‘সাইপ্রিয়ানের প্লেগ’। তিনি এই মহামারির প্রত্যক্ষদর্শী এবং এর বিবরণ রেখে গেছেন।

মহামারির ভয়াবহতা দেখে তিনি বলেছিলেন- এই প্লেগে পৃথিবী নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। জানা যায়, কেবল রোমেই নাকি একদিনে ৫০০০ মানুষ মারা গিয়েছিল। যদিও ঠিক কোন রোগ থেকে এই মহামারি ঘটেছিলো, তা এখনো নিশ্চিতভাবে আবিষ্কৃত হয়নি; তবে গবেষণা থেকে ধারণা করা হয় যে, এর লক্ষণগুলির মধ্যে ছিলো জলবসন্ত, ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং ইবোলা ভাইরাসের মতো প্রচণ্ড ক্ষতিকারক জ্বর। তাছাড়া লাগাতার ডায়রিয়া এবং ভেতরে একধরনের দহন সৃষ্টি হয়ে মুখের ভেতর ক্ষত তৈরি হতো। খুব সম্প্রতি, ২০১৪ সালে, প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এই প্লেগের শিকার মানুষদের এক বিশাল গণকবর আবিষ্কার করেছেন।

৪। জাস্টিনিয়ানের প্লেগ (Plague of Justinian): ৫৪১-৫৪২ খ্রিস্টাব্দ

বাইজেন্টাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ান-এর আমলে (৫২৭-৫৬৫) এই প্লেগের শুরু। তাঁর সময়েই বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য সর্বোচ্চ বিস্তার লাভ করে। রাজধানী কনস্টানটিনোপলে (বর্তমান ইস্তান্বুল) জাস্টিনিয়ান ‘হাজিয়া সোফিয়া’ নামের সুবিশাল ক্যাথেড্রাল নির্মাণ করেন। জাস্টিনিয়ান নিজেও প্লেগে আক্রান্ত হয়েছিলেন; যদিও তিনি আরোগ্যলাভ করেন। তার নামেই এই মহামারির নামকরণ হয়েছে। এই মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য খর্ব হতে থাকে। বলা হয়, এই প্লেগ দিয়ে বাইজেন্টিয়াম সভ্যতার ধ্বংসের শুরু। এই প্লেগ শতাব্দি জুড়ে বারে বারে ফিরে এসেছিল। কোনো কোনো হিসেবে পৃথিবীর প্রায় ১০ ভাগ মানুষ এই মহামারিতে মৃত্যুবরণ করে।

দ্য প্লেগ অব জাস্টিনিয়ান ৫৪১ খ্রি aloasbei.com
দ্য প্লেগ অব জাস্টিনিয়ান ৫৪১ খ্রি. aloasbei.com

৫। কৃষ্ণমৃত্যু (The Black Death): ১৩৪৬-১৩৫৩

ধ্বংসচিহ্ন এঁকে এঁকে কৃষ্ণমৃত্যু যেন পরিভ্রমণ করেছিলো এশিয়া থেকে ইউরোপ। ১৩৪৭-এর অক্টোবর মাসে কৃষ্ণসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালির মেসিনা প্রদেশের সিসিলিয়ান বন্দরে ভিড়লো ১২টি জাহাজ। বন্দরে উপস্থিত লোকজন হতভম্ব হয়ে দেখলো জাহাজের নাবিকেরা প্রায় সকলেই মৃত। যারা তখনো জীবিত আছে, তাদের শরীরে কালো কালো ফোঁড়া। তা দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত আর পুঁজ। সিসিলি কর্তৃপক্ষ সঙ্গে সঙ্গে জাহাজগুলিকে বন্দরের বাইরে পাঠিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলো।

কিন্তু ততক্ষণে যা বিলম্ব হওয়ার তা হয়েছে। কোনো কোনো হিসেবে এই বৈশ্বিক মহামারি চতুর্দশ শতকে ইউরোপের প্রায় অর্ধেক (আনুমানিক ২ কোটি/২০ মিলিয়ন) জনসংখ্যাই নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলো। যারসিনিয়া পেস্টিস (Yersinia pestis) নামের এক ব্যাকটেরিয়া ছিল এর মূলে- যা এখন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বলেই গবেষকদের ধারণা। এই ব্যাকটেরিয়া ইঁদুরের দ্বারা সংক্রমিত হয়েছিল। মৃতদের স্থান হয়েছিলো গণকবরে। প্রায় ৪ শতাব্দী ধরে ফিরে ফিরে আসা কৃষ্ণমৃত্যুর এই দীর্ঘ পর্যায় ইউরোপের ইতিহাসের বাঁক ঘুরিয়ে দিয়েছিলো। এই বিপুল মৃত্যুর পর কাজের জন্য শ্রমিক পাওয়া দুর্লভ হয়ে উঠেছিল। ফলাফল হিসেবে শ্রমিকদের মজুরি কিছুটা বৃদ্ধি পায় এবং সম্ভবত কারিগরী আবিষ্কারের প্রণোদনাও তৈরি হয়।

দ্য ব্ল্যাক ডেথ বা কৃষ্ণমৃত্যু (১৩৪৬-১৩৫৩)aloasbei.com
দ্য ব্ল্যাক ডেথ বা কৃষ্ণমৃত্যু (১৩৪৬-১৩৫৩)aloasbei.com

৬। কোকোলিজৎলি মহামারি (Cocoliztli epidemic): ১৫৪৫-১৫৪৮

মেপিকো এবং মধ্য আমেরিকার ১.৫ কোটি (১৫ মিলিয়ন) মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিলো এই মহামারিতে। এটা ছিল একধরনের হেমোরেজিক ফিভার। এমনিতেই মহামারির আগে থেকেই এই অঞ্চলে চূড়ান্ত দুর্ভিক্ষের কারণে মানুষ ছিল বিপর্যস্ত; তার ওপর এই রোগ একেবারে ধ্বংস ডেকে আনে। এই মহামারির শিকার মৃতমানুষের ডি এন এ পরীক্ষা করে খুব সাম্প্রতিক এক গবেষণা জানাচ্ছে যে, Salmonella নামের এক ব্যাকটেরিয়ার উপগোত্র Salmonella paratyphi C থেকে এই রোগের সংক্রমণ ঘটেছিলো।
এর লক্ষণগুলোর মধ্যে উচ্চ তাপমাত্রা বা টাইফয়েড, জলশুন্যতা বা ডিহাইড্রেশন এবং পেটের পীড়া অন্তর্ভুক্ত। অবশ্য এইসব সমস্যা আজও বড়ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে থেকে গেছে।

৭। আমেরিকান প্লেগ (American Plagues): ষোড়শ শতাব্দী

ইনকা এবং এ্যাজটেক সভ্যতা ধ্বংসের পেছনে এই মহামারির গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে বলে ধারণা করা হয়। ইউরোপ থেকেই জলবন্তসহ একগুচ্ছ মারণরোগের আমেরিকায় অভিযান ঘটেছিলো এই মহামারিকালে। কোনো কোনো হিসেবে বলা হয় যে, পশ্চিম গোলার্ধের প্রায় ৯০ ভাগ আদিবাসী এতে নিশ্চিহ্ন হয়। ১৫১৯ এবং ১৫৩২ সালে দুইদফায় স্পেনীয় সেনাঅভিযানের মাধ্যমে যথাক্রমে এ্যাজটেক এবং ইনকা সাম্রাজ্য বেদখল হয়। এই দুই যুদ্ধেই এ্যাজটেক এবং ইনকা সৈন্যবাহিনী পরাভূত হয় মূলত মারণরোগে দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে। জনসংখ্যা কমে যাওয়ার ফলে পরবর্তীতে বৃটেন, ফ্রান্স, পর্তুগাল এবং নেদারল্যান্ডের অধিবাসীদের এসব এলাকায় বসত গড়ে তোলা সহজ হয়।

৮। লন্ডনের বৃহৎ প্লেগ (Great Plague of London): ১৬৬৫-১৬৬৬

কৃষ্ণমৃত্যুর শেষ ধাক্কায় রাজা দ্বিতীয় চার্লসের নেতৃত্বে বিশালসংখ্যক মানুষ লন্ডন থেকে অভিবাসনে চলে গিয়েছিলো। ১৬৬৫ সালের এপ্রিলে যে প্লেগ শুরু হয়েছিলো, তার সংক্রমণ ঘটানোর পেছনে প্লেগ-আক্রান্ত ইঁদুরেরই ভূমিকা ছিল প্রধান। বছরখানেকের মধ্যেই লন্ডনের ১৫ ভাগ অধিবাসীসহ মোট প্রায় ১০০০০০ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল। প্লেগের পাশাপাশি দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১৯৬৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর লন্ডনে ৪ দিনব্যপী এক বিশাল অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়, যার ফলে নগরের এক বৃহৎ অংশ ভস্মীভূত হয়।

দ্য গ্রেট প্লেগ অব লন্ডন (১৬৬৫-১৬৬৬) aloasbei.com
দ্য গ্রেট প্লেগ অব লন্ডন (১৬৬৫-১৬৬৬) aloasbei.com

৯। মার্সাইয়ের বৃহৎপ্লেগ (Great Plague of Marseille): ১৭২০-১৭২৩

পূর্ব-ভূমধ্যসাগর থেকে গ্র্যান্ড সেইন্ট আন্তোয়েন নামের এক পণ্যবাহী জাহাজ ফ্রান্সের মার্সাই বন্দরে নোঙর করার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় এই ভয়াবহ প্লেগ। যদিও জাহাজটিকে কোয়ারেন্টাইন করা হয়েছিলো, কিন্তু তারমধ্যেই ইঁদুরবাহিত প্লেগ শহরে ঢুকে পড়ে। এই প্লেগ খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, এবং পরের তিন বছরে মার্সাইয়ে এবং আশেপাশের এলাকার প্রায় ১০০০০০ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। এরমধ্যে মার্সাইয়ের জনসংখ্যার ৩০ ভাগ মানুষ ছিল। ইউরোপে কৃষ্ণমৃত্যুর এটাকেই সর্বশেষ পর্যায় বিবেচনা করা হয়।

গ্রেট প্লেগ অব মার্সেই ১৭২0 aloasbei.com
গ্রেট প্লেগ অব মার্সেই মহামারি ১৭২0 aloasbei.com

১০। রাশিয়ার প্লেগ (Russian plague): ১৭৭০-১৭৭২ (Russian plague)

রাশিয়ার এই মহামারির সময় খুব ভয়ঙ্কর কিছু ঘটনা ঘটেছিলো। প্লেগ-জর্জরিত মস্কোয় কোয়ারেন্টাইনে রাখা অধিবাসীরা প্রচন্ড বিশৃঙ্খলা শুরু করে। শহরে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। কেউ কোনো নির্দেশ মান্য করছিল না। পরিস্থিতি এমন ভয়ানক হয়ে ওঠে যে, আর্চবিশপ এ্যামব্রোসিয়াস যখন প্রার্থনার জন্য সমাবেশ করতে নিররুৎসাহিত করলেন, তখন উন্মত্ত জনতা তাকে হত্যা করে। রাশিয়ার সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় ক্যাথেরিন (ক্যাথেরিন দ্য গ্রেট) জনশৃংখলা ফিরিয়ে আনা ও প্লেগ নিয়ন্ত্রণের জন্য মরিয়া হয়ে আদেশ জারি করলেন যে সব কারখানা মস্কো থেকে সরিয়ে নিতে হবে। এই মহামারিতে প্রায় ১০০০০০ লোকের মৃত্যু হয়েছিলো।

১১। প্রথম কলেরা মহামারি (১৮১৭-১৮২৪):

এটি এশিয়াটিক কলেরা মহামারি নামেও পরিচিত। ১৮১৭ সালে প্রথম কলকাতা শহর থেকে শুরু হয়ে এই মহামারি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব আফ্রিকা, চীন, ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী স্থানগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। থাইল্যান্ডে কলেরা মহামারী প্রথম ধরা পড়েছিল ১৮২০ সালে, ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপাইনে সহ এশিয়ার দেশগুলিতে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই জীবাণুটির কারণে এশিয়ায় ১ লাখ এরও বেশি মানুষের মৃত্যুর রেকর্ড করা হয়েছিল। কলেরার ব্যাকটেরিয়ায় দূষিত এক জলাশয়ের জল খেয়েই প্রথম মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন।

১২। বৈশ্বিক মহামারি ফ্লু (Flu pandemic): ১৮৮৯-১৮৯০

এই ফ্লুতে প্রথম আক্রান্তের খবর পাওয়া যায় রাশিয়ায়। সেন্ট পিটার্সবুর্গে অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিলো এই ভাইরাস। যদিও পৃথিবীতে তখন পর্যন্ত্ম আকাশপথে যাতায়াত শুরু হয়নি, তবু মাত্র কয়েকমাসের মধ্যে ইউরোপ এবং সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে এই ফ্লু। ৫ সপ্তাহের মধ্যে মহামারিটি চূড়ান্ত রূপ নেয়। প্রায় ১ মিলিয়ন (১০ লক্ষ) মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিলো।

১৩। আমেরিকান পোলিও (American polio epidemic): ১৯১৬

আজকাল সকল শিশুকে পোলিওর টিকা খাওয়ানো বাধ্যতামূলক করা হলেও ১০০ বছর আগে এটি ছিল এক ভয়াবহ ব্যাধি যার কোনো ভ্যাকসিন ছিল না। পোলিও মুলত শিশুদেরই হয় এবং কখনো কখনো শিশুর শরীরে স্থায়ী প্রতিবন্ধিতা রেখে যায়। ১৯১৬ সালে নিউইয়র্কে ২৭০০০ শিশু পোলিও আক্রান্ত হয় এবং সমস্টত্ম যুক্তরাষ্ট্রে ৬০০০ মৃত্যু ঘটে। ১৯৫৪ সালে সাল্ক ভ্যাকসিন আবিষ্কার হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঝে মাঝেই এই রোগ দেখা যেতো। যদিও পোলিও এখনো নিশ্চিহ্ন হয়নি, তবে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পর থেকে পৃথিবীতে এই রোগের হার একেবারেই কমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে সর্বশেষ পোলিও আক্রান্তের তথ্য পাওয়া যায় ১৯৭৯ সালে।

১৪। স্প্যানিশ ফ্লু (Spanish Flu): ১৯১৮-১৯২০

স্প্যানিশ ফ্লুকে ভয়াবহতম বৈশ্বিক মহামারি বলা যেতে পারে। দক্ষিণ সাগর থেকে উত্তর মেরু পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মিলিয়ন/৫০ কোটি মানুষ স্প্যানিশ ফ্লুর শিকার হয়েছিলো। এরমধ্যে মৃত্যুবরণ করে প্রায় ৫০ মিলিয়ন (৫ কোটি)। অনেক আদিবাসী সম্প্রদায় প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার মুখে চলে যায়। শিশু থেকে বৃদ্ধ, সুস্থ কিংবা দুর্বল সকলেই এই ফ্লুর শিকার হয়। প্রথম মহাযুদ্ধের অন্তিম লগ্নে এই মহামারির সূচনা। ঐতিহাসিকদের ধারণা যে, যুদ্ধকালে ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে সৈন্যরা যখন অত্যন্ত নোংরা এবং আর্দ্র পরিবেশে থাকতে বাধ্য হলো এবং খাদ্যাভাবে প্রচন্ড অপুষ্টির শিকার হলো তখন তাদের প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ায় অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং তখনি তারা এই ভাইরাসের শিকার হয়। যদিও ৩ দিনের মধ্যে অনেকে সুস্থ হয়ে ওঠে, কিন্তু অনেকেই সুস্থ হয়নি। সৈনিকেরা নিজ দেশে ফিরে আসার পরই দ্রুত শহর-গ্রাম-জনপদে ছড়িয়ে পড়ে এই ফ্লু।
এই ফ্লু’র সঙ্গে স্পেনের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রথম মহাযুদ্ধে স্পেন ছিল নিরপেক্ষ অবস্থায়। তাদের সংবাদমাধ্যম ছিল স্বাধীন। যুদ্ধকালীন সংবাদ তারা নিরপেক্ষভাবেই প্রকাশ করতো। তারাই প্রথম এই ফ্লুর সংবাদ পরিবেশন করে। সে কারণে এই ফ্লুর নাম হয়ে যায় স্প্যানিশ ফ্লু।

১৫। এশিয়ান ফ্লু (Asian flu): ১৯৫৭-১৯৫৮

এটাও ইনফ্লুয়েঞ্জাভিত্তিক বৈশ্বিক মহামারি। চীন থেকে উদ্ভূত এই মহামারিতে প্রায় ১ মিলিয়ন (১০ লক্ষাধিক) মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিলো। এরমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রেই ছিলো ১১৬০০০ মানুষ। এভিয়ান ফ্লু গোত্রের সমন্বিত ভাইরাসের আক্রমণে সংঘটিত এই মহামারি খুবই দ্রুত বিস্তার লাভ করেছিলো। ১৯৫৭-এর ফেব্রুয়ারিতে সিঙ্গাপুরে, এপ্রিলে হংকংয়ে এবং তারপরই যুক্তরাষ্ট্রের সমুদ্র-উপকূলীয় নগরগুলিতে এটা ছড়িয়ে পড়ে।

১৬। এইডস (AIDS pandemic): ১৯৮১ থেকে বর্তমান

বিংশ শতাব্দীর শেষপ্রান্তে এসে এইডস (Acquired Immune Deficiency Syndrome-AIDS) বৈশ্বিক মহামারির রূপ নিলেও এর প্রারম্ভে ১৯২০ সালে। যতদূর জানা যায়, পশ্চিম আফ্রিকায় এক শিম্পাঞ্জি ভাইরাস থেকে মানবদেহে স্থানান্তরণের মাধ্যমে এইডস-এর মূল ভাইরাস এইচআইভির [Human immunodeficiency virus (HIV)] উৎপত্তি। এই ভাইরাস চিহ্নিত হওয়ার পর থেকে ৩৫ মিলিয়নের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। এখন আক্রান্ত্মদের প্রায় ৬০ ভাগই সাব-সাহারান আফ্রিকা অঞ্চলের অধিবাসী। দীর্ঘকাল এই ভাইরাসের প্রতিষেধক ছিল না। তবে ১৯৯০ থেকে একধরনের নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে অসুস্থতা নিয়েও আক্রান্তব্যক্তি স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারছে। ২০২০ সালে আরো কিছু অগ্রগতি হয়েছে।

১৭। H1N1 সোয়াইন ফ্লু (H1N1 Swine Flu pandemic): ২০০৯-২০১০

২০০৯ সালে সোয়াইন ফ্লু প্রথম মেপিকোয় চিহ্নিত হয়। এটা GUv H1N1 গোত্রের একটা নতুন ভাইরাস। দ্রুতই সমস্ত বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এই ভাইরাস, এবং মাত্র একবছরে ১.৪ বিলিয়ন মানুষ আক্রান্ত হয়। আনুমানিক ১৫১৭০০ থেকে ৫৭৫৪০০ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। এই ভাইরাসের প্রধান শিকার হয়েছে শিশু এবং তরুণরা। ৮০ ভাগ মৃত্যুই ঘটেছে ৬৫ বছর বয়সের নিচের জনসংখ্যায়। যদিও ব্যাপারটা খুব অস্বাভাবিক, কারণ বেশিরভাগ ফ্লু ভাইরাসের ক্ষেত্রে প্রধান মৃত্যুহার ৬৫-উর্ধ্ব বয়সীদের মধ্যেই ঘটে। ধারণা করা হচ্ছে যে, ৬৫-উর্ধ্ব বয়সীরা সম্ভবত H1N1 গোত্রের অন্যান্য ভাইরাস-প্রতিরোধী শক্তি অর্জন করে ফেলায় সো্‌য়াইন ফ্লু আর তাদেরকে খুব কাবু করতে পারেনি। এই ভাইরাসের ভ্যাকসিন পাওয়া গেছে।

১৮। পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলা (West African Ebola epidemic): ২০১৪-২০১৬

১৯৭৬-এ প্রথম সুদান ও কঙ্গোয় ইবোলার প্রকাশ ঘটে। অনুমান করা হয় যে ভাইরাসটি বাদুড় থেকে এসেছে। ২০১৪ থেকে ২০১৬-এর মধ্যে পশ্চিম আফ্রিকায় ২৮৬০০ জন ইবোলা ভাইরাস আক্রান্ত হয় এবং ১১৩২৫ জন মৃত্যুবরণ করে বলে জানা যায়। ২০১৩-এর ডিসেম্বরে আক্রমণ হয় গিনিতে। এরপর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে লাইবেরিয়া এবং সিয়েরা লিয়নে। মূলত এই তিন দেশই ইবোলার প্রধান আক্রমণক্ষেত্র। তবে আরো কিছু মানুষ আক্রান্ত্ম হয় নাইজেরিয়া, মালি, সেনেগাল, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে। ইবোলার ভ্যাকসিন আবিষ্কারের কাজ চলছে।

১৯। জিকা ভাইরাস (Zika Virus epidemic): ২০১৫ থেকে বর্তমান

জিকা ভাইরাস শিশু কিংবা বয়স্ক কারো জন্যই তেমন ক্ষতিকর নয়। কিন্তু এই ভাইরাস ভয়াবহ ক্ষতি করতে পারে মায়ের জঠরে থাকা এখনো জন্ম নেয়নি যে শিশু-তার। উষ্ণ এবং আর্দ্র পরিবেশ পছন্দ করে বলে ভাইরাসটি মাতৃগর্ভস্থ শিশুর ক্ষতি করে বেশি। জিকা ভাইরাসের আক্রমণে নানাধরনের বিকলাঙ্গতা নিয়ে জন্ম নেয় নবজাতক। এটা সাধারণত মশাবাহিত তবে যৌনসংক্রমণও ঘটে। এইডস গোত্রের মশাই এই জিকা ভাইরাস বহন করে। সাম্প্রতিককালে দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায় জিকা মহামারি আকার ধারণ করার আগে তেমন করে এর খবর পাওয়া যায়নি। মূলত আমেরিকায়ই এখনো জিকার চলাচল।

প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে পৃথিবীব্যাপী মহামারির তরঙ্গ প্রবহমান রয়েছে। এ প্রবহমানতার শেষ কোথায় তা এখনো বলা সম্ভব হয়নি। হয়তো কখনোই বলা সম্ভব হবে না, কারণ বিশ্বপ্রকৃতির লক্ষ ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াকে চেনা কবে শেষ হবে কে জানে! তবে এইসব মহামারির অভিজ্ঞতা থেকে আমরা অন্ত্মত সতর্কতা অবলম্বনে তো কিছুটা সচেতন ও সক্রিয় হতে পারি। মহামারির ভয়াবহ আতংকের দিনে পূর্বে যেসব সামাজিক অস্থিরতা-অসচেতনতা ঘটেছে আজ আবারও সেসবের পুনরাবৃত্তি থেকে তো নিজেদের মুক্ত রাখতে পারি! তাহলে অন্তত মহামারির ধ্বংসযজ্ঞকে সামাল দেয়া কিছুটা সহজ হবে।

২০। নভেল করোনা বা কোভিড-১৯ ( Novel Corona or Covid -19): ২০১৯- বর্তমান

চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া এ ভাইরাসের কারণে থমকে গেছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। করোনা ভাইরাস উহানের গণ্ডি পেরিয়ে গোটা চীন, সে দেশের সীমানা পেরিয়ে নানা দেশে ছড়াতে সময় লাগেনি। ঘরের ভেতরেই থাকতে হচ্ছে বিশ্বের প্রায় ৪০০ কোটি মানুষকে। ২১২ টি দেশ ও অঞ্চলে করোনা শনাক্ত হওয়ার রিপোর্ট পাওয়া গেছে! ০৮ মে, ২০২০ পর্যন্ত বিশ্বে প্রায় ৩৯ লাখ ১৪ হাজারের মতো মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২ লক্ষ ৭০ হাজার ৪২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে করোনা ভাইরাসের কারণে। মৃত্যুসংখ্যা তথা কোথায় গিয়ে থামবে এই প্রশ্ন আপাতত ভবিষ্যতের জন্যই তলা থাক ।

করোনা ভাইরাস ২০১৯ aloasbei.com
করোনা ভাইরাস ২০১৯ aloasbei.com

 

সূত্র: বিবিসি অনলাইন, ইউনিসেফ, ওয়ার্ল্ডোমিটার, শিল্ডস গেজেটসসহ বিভিন্ন ওয়েবসাইট

আরও জানতে পড়তে পারেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ : সংক্ষিপ্ত ও সহজ ইতিহাস

2

Leave a Reply

%d bloggers like this: