স্বাস্থ্য

থাইরয়েড সমস্যার চিকিৎসায় করণীয়

থাইরয়েড গ্রন্থি (Thyroid Gland)থাইরয়েড গ্রন্থি (Thyroid Gland)

থাইরয়েড

সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বর্তমানে বিশ্বে অনেক। আমাদের চারপাশে প্রতি আটজন নারীর একজন থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত। ছোট বালিকা থেকে শুরু করে বয়স্ক নারী—যে কেউ যেকোনো সময় হাইপোথাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন। থাইরয়েডের সমস্যায় সব সময় যে গলগণ্ড হবে বা গলার গ্ল্যান্ড ফুলবে, তাও নয়। দেখা যায়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি খুব সামান্য উপসর্গ নিয়ে ধরা পড়ে, কখনো কখনো কোনো উপসর্গ থাকেই না।

থাইরয়েড কি?

থাইরয়েড একটি এনড্রোক্রাইন গ্ল্যান্ড বা হরমোন গ্রন্থি। এটা মানুষের গলার সামনে অবস্থিত। এখান থেকে থাইরয়েড হরোমন তৈরি হয়। এই হরমোন আমাদের শরীরের মেটাবলিক হার ও প্রোটিন সংশ্লেষ, রেচন প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে থাকে। এই হরমোন নিঃসরণের ভারসাম্যহীনতার প্রভাব মানুষের দৈহিক স্বাস্থ্য এমনকি তার মানসিক ও অনুভূতিগত স্বাস্থ্যের উপরেও পড়ে। একজন শিশু যদি ছোট বেলা থেকে এই হরমোনের অভাবে ভোগে তাহলে সে প্রতিবন্ধী হয়ে বড় হবে।

থাইরয়েড গ্রন্থি সাধারণত দুই ধরনের হরমোন নিঃসরণ করে।
1. ট্রাই-আয়োডোথাইরোনিন(T3)
2. থাইরক্সিন(T4)

বাচ্চাদের ক্ষেত্রে জন্মের সময় এই গ্রন্থি ঠিকভাবে তৈরি না হলে কিংবা প্রয়োজনমত হরমোন তৈরি করতে না পারলে বাচ্চাদের শারীরিক এবং মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। আমাদের শরীরে যতটুকু হরমোন প্রয়োজন তার চেয়ে কম কিংবা বেশি পরিমাণে এই হরমোন তৈরি হলে তখন নানা রকম সমস্যা দেখা দেয়। প্রয়োজনের তুলনায় কম পরিমাণে এই হরমোন তৈরি হলে হাইপোথাইরয়ডিজম হতে পারে। আবার প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পরিমাণে এই হরমোন উৎপন্ন হলে হাইপারথাইরয়ডিজম হতে পারে। উভয়ই আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত বিষয়গুলো হল-

• হাইপোথাইরয়ডিজম (Hypothyroidism)
• হাইপারথাইরয়ডিজম (Hyperthyroidism)
• গয়েটার (Goiter) বা গলগণ্ড
• নডিউল (Nodule) বা টিউমার
• থাইরয়েড ক্যান্সার (Thyroid Cancer)

হাইপোথাইরয়ডিজম (Hypothyroidism):

থাইরয়েড গ্রন্থি যদি প্রয়োজনের তুলনায় কম হরমোন উৎপাদন করে তখন হাইপোথাইরয়ডিজম হবার সম্ভাবনা আছে। যদিও অনেক সময় এর চোখে পড়ার মত লক্ষণ দেখা যায়না, যার ফলে অনেকে বুঝতেই পারেন না তারা হাইপোথাইরয়ডিজম এ আক্রান্ত।

হাইপোথাইরয়ডিজম হলে সাধারণত যে লক্ষণগুলো দেখা যায় তা হলঃ

• ক্লান্তি কিংবা অবসাদ অনুভব করা
• কোনো কিছুতে মনোযোগ দিতে না পারা
• হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া
• শুষ্ক ত্বক
• কোষ্ঠকাঠিন্য
• অল্পতেই শীত শীত লাগবে
• পেশী এবং বিভিন্ন জয়েন্টে ব্যথা অনুভূত হবে
• বিষণ্ণতা থাকবে
• মহিলাদের ক্ষেত্রে ঋতুস্রাবের সময় অতিরিক্ত পরিমাণ রক্তক্ষরণ হতে পারে
• পালস রেট কম থাকতে পারে স্বাভাবিক এর তুলনায়
• অনেকের নখে ফাটল দেখা দেয়

হাইপারথাইরয়ডিজম (Hyperthyroidism):

এক্ষেত্রে হাইপোথাইরয়ডিজম এর উল্টো ঘটনা ঘটে। থাইরয়েড গ্রন্থি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হরমোন উৎপাদন করলে হাইপারথাইরয়ডিজম হবার সম্ভাবনা থাকে। থাইরয়েড গ্রন্থিকে নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্রন্থি নামক এক গ্রন্থি। মস্তিষ্কের এই পিটুইটারি গ্রন্থি কে আবার নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস নামক অংশ। এই হাইপোথ্যালামাস থাইরয়েড রিলিজিং হরমোন (TRH) নামক এক হরমোন নির্গত করে।

এই TRH হরমোন এর কাজ হল পিটুইটারি গ্রন্থি কে থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন (TSH) নামক এক হরমোন নির্গত করার জন্য সংকেত পাঠানো। এই TSH হরমোন উক্ত গ্রন্থি কে থাইরয়েড হরমোন নির্গত করার জন্য সংকেত পাঠায়। বোঝা গেল তাহলে এই হরমোন উৎপাদন এর জন্য শুধুমাত্র থাইরয়েড গ্রন্থি দায়ী নয়। হাইপোথ্যালামাস, পিটুইটারি গ্রন্থি এবং থাইরয়েড গ্রন্থির মিলিত প্রচেষ্টায় হরমোন নির্গমন কাজ সম্পন্ন হয়।

এখন উক্ত ৩ টি গ্রন্থির যে কোনো একটি বা একাধিক গ্রন্থি যদি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কাজ করে ফেলে তখন ফলাফল হিসেবে যতটুকু হরমোন দরকার তার চেয়ে বেশি পরিমাণ হরমোন উৎপন্ন হয়। আর তখনই বাঁধে সমস্যা। যেটা হাইপারথাইরয়ডিজম নামে পরিচিত।

হাইপারথাইরয়ডিজম হলে সাধারণত যে লক্ষণগুলো দেখা যায়:

• অতিরিক্ত ঘাম
• গরম সহ্য না করতে পারা
• হজমে সমস্যা
• দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ বেড়ে যাওয়া।
• অস্থিরতা অনুভব করা।
• হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া
• পালস রেট বেড়ে যাওয়া
• ঠিকমত ঘুম না হওয়া
• চুল পাতলা এবং ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া
• ত্বক পাতলা হয়ে যাওয়া
• মহিলাদের ক্ষেত্রে ঋতুস্রাব অনিয়মত কিংবা খুব অল্প পরিমাণে হওয়া।
• বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে হৃদস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে। খুব খারাপ অবস্থা হলে এবং হাইপারথাইরয়ডিজম এর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না নেয়া হলে থাইরয়েড স্টর্ম(thyroid storm) হতে পারে। এতে রোগীর রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে, জ্বর আসতে পারে এবং হৃদস্পন্দন বন্ধ ও হয়ে যেতে পারে।

গয়েটার (Goiter) বা থাইরয়েড গ্রন্থিতে গলগণ্ড:

যদি থাইরয়েড গ্রন্থিটিই বড় হয়ে যায় সেক্ষেত্রে একে গয়েটার (Goiter) বা গলগণ্ড বলা হয়ে থাকে। যেহেতু গ্রন্থিটি হরমোন তৈরির জন্য আয়োডিন এর প্রয়োজন পড়ে সেহেতু আয়োডিনের অভাব হলে গ্রন্থিটি হরমোন ঠিকভাবে তৈরি করতে পারেনা । তবুও এটি চেষ্টা করে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় হরমোন তৈরি করতে। ফলস্বরূপ এটি নিজে বড় হয়ে যায় শরীরের হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে। একটা সময় এটি আর পারেনা সেই স্বাভাবিক মাত্রায় হরমোন তৈরি করতে।

ফলে হরমোন এর পরিমাণ কমে যায় প্রয়োজনের তুলনায়। ফলাফল হিসেবে উক্ত ব্যক্তি হাইপোথাইরয়ডিজম এ আক্রান্ত হয়। এজন্য যেসব শিশু বা মানুষ আয়োডিন এর স্বল্পতায় ভুগে তাদের এই রোগ হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তবে বর্তমানে লবণের সাথে আয়োডিন গ্রহণের ফলে এই রোগের প্রাদুর্ভাব অনেকাংশেই কমে এসেছে।

থাইরয়েড গ্রন্থিতে গলগণ্ড (goiter)
থাইরয়েড গ্রন্থিতে গলগণ্ড (goiter)

থাইরয়েড গ্রন্থিতে গলগণ্ড (goiter)

নডিউল (Nodule) বা থাইরয়েড গ্রন্থিতে টিউমার :

এই গ্রন্থিতে যদি টিউমারও হতে পারে, যাকে নডিউল (Nodule) বলে। এক্ষেত্রে এই টিউমার সংখ্যায় এক বা একাধিক হতে পারে। বিভিন্ন আকারের হতে পারে। তবে টিউমার হলেই সবক্ষেত্রে ক্যান্সার হয়না। তবে অবস্থা বেশি খারাপ হলে এবং কোনো চিকিৎসা না নেয়া হলে এটি ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। যাকে বলা হয় থাইরয়েড ক্যান্সার

থাইরয়েড গ্রন্থিতে টিউমার (Nodule)
থাইরয়েড গ্রন্থিতে টিউমার (Nodule)

থাইরয়েড গ্রন্থিতে টিউমার (Nodule)

উপর্যুক্ত আলোচনা যদি আপনার কাছে খুব কঠিন মনে হয় তাহলে আপনার জন্য নিচের প্রশ্নগুলো। এখন নিচের প্রশ্নগুলোর সাথে আপনার উত্তর মিলিয়ে নিন।

ক) এর মধ্যে ২ টির কম প্রশ্নের জবাব যদি ‘হ্যাঁ’ হয় তাহলে আপনি বেশ সুস্থ আছেন।
খ) ২-৪ টি প্রশ্নের জবাব যদি ‘হ্যাঁ’ হয় তাহলে আপনার উক্ত রোগ থাকার সম্ভাবনা আছে কিন্তু তা কম মাত্রায়।
গ) ৪ এর অধিক প্রশ্নের জবাব যদি ‘হ্যাঁ’ হয় তাহলে ধরে নিতে হবে আপনার এই রোগ থাকার সম্ভাবনা প্রবল ।

• আপনার আঙুলের নখগুলো কি পুরু ও ভঙ্গুর?
• ত্বক কি শুষ্ক ও চোখগুলো কি প্রায়ই জ্বালা করে?
• হাত পা কি ঠাণ্ডা?
• গলার স্বর কি ভাঙা?
• চুল কি মোটা, চুল পাতলা হয়ে যাচ্ছে বা পরে যাচ্ছে?
• আই ভ্রুর বাইরের দিক কি পাতলা হয়ে যাচ্ছে?
• ঘাম কি বেশী হয়?
• অল্পতেই কি খুব ক্লান্ত হয়ে যান?
• রজঃচক্র কি অনিয়মিত?
• যৌন বাসনা কি কমে গেছে?
• রজঃনিবৃত্তি পরবর্তী অথবা PMS কি সাংঘাতিক?
• হাত পা কি ঘন ঘন ফুলে যায়?
• রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন কি ভাল না?
• কোলেস্টেরল এর মাত্রা কি বেশি?
• কোন কিছু স্মরণ করতে বা মনঃসংযোগ করতে কি আপনার সমস্যা হয়?
• আপাত কোন কারণ ছাড়াই কি আপনার ওজন বাড়ে অথবা কমে?
• অবসাদ, খাম-খেয়ালীপনা, উদ্বেগ, খিটখিটে ভাব কি আছে?
• পেশীর ক্লান্তি, ব্যথা অথবা দুর্বলতা কি আছে?
• বিকিরণ চিকিৎসার ঘটনা আছে কি?
• বিষের সংস্পর্শে আসার ইতিহাস আছে কি?
• পরিবারে আরও যেমন মা- এদের কারো কি থাইরয়েড সমস্যা আছে কি?

যদি ৪ এর অধিক প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ হয় তবে আর দেরী না করে আজই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু করুন।

 

 

তথ্যসূত্র: ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক, বিজ্ঞানবাংলা, অ্যামাজন

আরও পড়তে পারেন: কোমর ব্যথা বা ব্যাক পেইন কি, কেন হয় ও তার প্রতিকার

0

Leave a Reply

%d bloggers like this: