গল্প

মেঘ কিংবা কৃষ্ণচূড়ার গল্প

মেঘ কিংবা কৃষ্ণচূড়ার গল্প-aloasbei.comমেঘ কিংবা কৃষ্ণচূড়ার গল্প-aloasbei.com

মেঘ কিংবা কৃষ্ণচূড়ার গল্প

#ছোট গল্প

তুমি কি কাল আমার সাথে কফি খেতে যাবে?

ল্যাপটপে কথাটা টাইপ করতে সাকিবের সময় লেগেছে দশ মিনিট তিপ্পান্ন সেকেন্ড। লেইট টুয়েন্টিজে এসে এমন ইতস্ততবোধ করা খুব ভাল লক্ষ্মণ নয়। সাকিবের এই কথাটা টাইপ করার সময় মনে ছিলো না, মনিটরের ঐ প্রান্তে থাকা মানুষটার চ্যাটবক্সে দশ মিনিট তিপ্পান্ন সেকেন্ড যাবত তিনটে ডট ঢেউ খেলে যাচ্ছে অবিরত। ও পাশের মানুষটার নাম মেঘলীনা। তাকে সংক্ষেপে মেঘ কিংবা লীনা ডাকা যেতে পারে। তার কাছের মানুষেরা তাকে লীনা ডাকলেও গুণে গুণে তিনটা মানুষ তাকে মেঘ বলে ডাকে। মেঘলীনার বড় ভাই, মেঝো চাচা আর সাকিব। অনেকদিন থেকে মেঘলীনাকে সাকিব লক্ষ্য করে যাচ্ছিলো। হাসি খুশি একটা মেয়ে। প্রচন্ড চঞ্চল। দূর থেকে যাকে ঘাস ফড়িং মনে হয় অথবা একটা তিরতির করে কাঁপতে থাকা একটা কৃষ্ণচূড়া।

মেঘলীনা দশ মিনিট ধরে গালে হাত দিয়ে বসে দেখলো তার ল্যাপটপের চার কোনা স্ক্রীনে নীল রঙের তিনটা ডট ঢেউ খেলে যাচ্ছে। ওর খুব হাসি পেয়ে যাচ্ছিলো। কারো বলার থাকলে সেটা ঠাস করে বলে দিলেই ল্যাঠা চুকে যায় এই বোধ খুব বেশি মানুষের নেই। নেই বলেই লাইফ কমপ্লিকেটেড। শেষ পর্যন্ত টুক করে আওয়াজ তুলে জানান দিলো টাইপরত মানুষটা শেষ পর্যন্ত সাহসী হয়ে উঠেছে। কফি খাবার প্রস্তাব। মেঘলীনা হেসে জানিয়ে দিলো হ্যাঁ সে কফি খেতে যাবে।

কৃষ্ণচূড়া সাকিবের প্রিয় ফুল। আরেকটা ফুল ও খুব ভালো লাগে ওর। সোনালু। মাথা ধরানো আঁশটে গরমের দিনে কচি লেবু পাতা রঙের ডাল বেয়ে সোনালু ঝুলে থাকা গাছ গুলো ওর খুব পছন্দ। যেদিন মেঘের সাথে প্রথম পরিচয় হয়েছিলো, সেদিনটা সাকিব মনে করতে পারে। গ্রীষ্ম ছিলো। বরাবর শীতের দিন ভালোবেসে আসা সে দূর থেকে প্রায়ই মেয়েটা কে দেখতো। তাকে লীনার নীরব শুভাকাঙ্খী বলা যেতে পারে। তবুও কথা হয়ে গেলো। কফি শেষ করে সে মেঘলীনাকে বাসায় পৌঁছে দিলো। প্রথম যেদিনই কথা হলো সেদিন রাতটা ফুরিয়েছিলো খুব দ্রুত। সেদিন তিন গোয়েন্দা নিয়ে কথা হলো, কথা হলো অর্ণবকে নিয়ে, জানা হলো বন্দী বাক্সের শহরে দুজনেরই প্রিয় রাত জেগে ছাদে মৃদু আওয়াজে কোল্ডপ্লে এর গান শোনা, লাইট উইল গাইড ইউ হোম… জানতে জানতে মেয়েটা কে ওর ভাল লেগে গেলো। প্রথম দিনই মেয়েটা কে জানিয়ে দিলো মেলানকোলি শব্দটার মানে জানতো না বলে জীবনের প্রথম ভালো লাগা মানুষটা তাকে খ্যাত বলেছিলো। মেঘলীনা হাসতে হাসতে উত্তর দিলো, লা ত্রিসতেথা মানেও দুঃখবিলাস, তোমার কাজ হচ্ছে এটা কোনদেশী শব্দ খুঁজে বের করবে। সাকিবের মুগ্ধতা মেঘ অথবা লীনার জন্য ঠিক সেই মূহুর্তে আরেকটু বেড়ে গেলো। কোন কিছু না জানার জন্য এই প্রথম তার লজ্জা করলো না, বরং কিভাবে আরেকটু জানা যায় সেই আগ্রহটা মনের ভেতর জাঁকিয়ে বসলো। দিন শেষে বোধহয় আমরা এমন কাউকে খুঁজি যার সাথে বেড়ে ওঠা যায়, যাকে নির্দ্বিধায় বলা যায়, আমি জানিনা, আমাকে শেখাবে?

তারপরের কিছুদিন ঘাসফড়িং এর মত লাফিয়ে বেড়ালো। দুইজন আবিষ্কারের নেশায় মগ্ন। প্রথম দেখা সমুদ্রের মত মুগ্ধ। তেল আর জলে মিশে যাওয়ার একটা চেষ্টা। সেখানে ঝাঁকুনি নেই। দুজনেই ভেসে বেড়ালো কারো মনে হলো না আমাদের হচ্ছে না। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সময়টা তখন তাদের হলো। তারা ভাবলো তাদের একটা ঘর হবে। তাদের চিলেকোঠা থেকে রাতের মেঘ দেখা যাবে। ভোরের শুকতারা দেখা যাবে। তারা একসাথে পাহাড় দেখবে। পাথর দেখবে।

কিন্তু সময়ের ও তারপর থাকে। প্রচন্ড ভাল লাগা থাকা স্বত্বেও সাকিব তাল ধরে রাখতে পারলোনা। অধিক ক্যালকুলেটিভ সাকিব হঠাৎ  করে মেপে মেপে কথা বলতে শুরু করলো লীনার সাথে। আচ্ছা আমরা বরং মেঘলীনা কে মেঘ বলে ডাকি। পেঁজা তুলোর মতো নরম একটা প্রাণকে মেঘই ডাকা ভালো হয়তো। সাকিব নিজের সাথেই অবিরত  যুদ্ধ  করতে লাগলো, কোন কথা টা বললে নিজেকে আরেকটু ‘কুল’ প্রমাণ করা যাবে, কোনটা বললে তাকে একটু ভারিক্কি মনে হতে পারে। নিজের উপর অনেক কিছু আরোপ করতে করতে সে ভুলে গেলো, যাকে ঘিরে তার ভালো লাগা কাজ করে, সে একটি সত্যি স্বত্তা। ভাণের জগত থেকে একটু দূরে তার বসবাস। কৃষ্ণচূড়া ফুলের মত হয়তো মেঘ। যার বেড়ে উঠতে হয়তো খুব যত্ন প্রয়োজন হয় না কিন্তু একটু অবহেলা কিংবা ঝড়ো বাতাসে সে সমূলে উপড়ে পড়তে পারে। সাকিব নিজেকে মাজতে লাগলো, আরেকটু ঝাঁ চকচকে করতে লাগলো, বুঝতেই পারলো না, নিজেকে বদলানোর সাথে সাথে সাদা মেঘের কোণে একটু একটু করে আঁচড় লাগতে শুরু করেছে। মেঘ ও বদলে যাচ্ছে। ভারী হয়ে যাচ্ছে। কালো হয়ে যাচ্ছে।যে কোন সময় মেঘ ঝরে যাবে। সাকিবের আড়ালে লুকানো কথা শোনার অপেক্ষায় থেকে থেকে মেঘ মুষড়ে যাচ্ছিলো। দুজনের মাঝে নেমে আসছিলো ঝড়!

আমরা যখন কোন কিছু চাই, সেটা খুব দ্রুত পেয়ে গেলে একটা ব্যাপার ঘটতে পারে। যা চাচ্ছিলাম তা খুব বেশিই সহজলভ্য মনে হয়। জিনিসটার আর মূল্য থাকেনা। ছোটবেলায় খেলনা গাড়ির কথা মনে আছে? আমরা খুব চাইতাম আমাদের ও একটা মোটর খেলনা গাড়ি থাকবে। চাইলেই যখন পেয়ে যেতাম, প্রথম ক’দিন গাড়িটি ধুয়ে মুছে যত্নে রাখতাম তারপর গাড়ির মিস্ত্রী হয়ে সেটা খুলে মোটর আলাদা করে সেই মোটরে কাগজ লাগিয়ে ব্যাটারী সংযুক্ত করে ফ্যান বানিয়ে নিজেদের ক্রিয়েটিভিটি দেখে মুগ্ধ হয়ে যেতাম। ভুলে যেতাম যে গাড়িটি খুব শখের ছিলো, চাওয়ার ছিলো। নিজেদের ইচ্ছা পূরণ খেলা খেলতে যেয়ে যত্নের গাড়িটি যে কয়েকটি টুকরো ফেলনা হয়ে গেছে আমাদের আর মনে থাকতো না। আমাদের তখন নতুন গাড়ি লাগবে। আমাদের বাবা মায়েরা তখন সাথে সাথেই নতুন গাড়ি আর দিতেন না। আমরা নতুন গাড়ির জন্য দীর্ঘমেয়াদী অপেক্ষায় চলে যেতাম। নতুন একটা গাড়ির মূল্য তখন অনেক।

আত্মমগ্ন সাকিব আর অভিমানী মেঘলীনার ক্ষেত্রে কোন ব্যাপারটা ঘটেছিলো এই ব্যাপারটা আমরা কেউ জানিনা। নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ, খুব সহজেই পেয়ে যাওয়া কিংবা মুগ্ধতার রেশ কেটে যাওয়া কোন একটা কিছু তো হয়েছিলো। মন খারাপের ব্যাপার হচ্ছে সাকিব আর মেঘলীনার গল্পটা পূর্ণতা পায়নি। তবে এই গল্পে একটা মন ভাল করা ব্যাপার ও রয়েছে। মেঘলীনা নামের মেয়েটা কিন্তু শেষ গ্রীষ্মের কৃষ্ণচূড়ার মত ঝরে যায়নি। সে আজ ও ঘাসফড়িং এর মত ঘুরে বেড়াচ্ছে, উড়ে বেড়াচ্ছে। একটা দীর্ঘমেয়াদী জীবনে পথ চলার সময় আমাদের অনেক মানুষের সাথে দেখা হয়ে যায়। সবাই সেখানে বসত গড়তে পারেনা। কিন্তু এই যে ক্ষণিকের পরিচয় থেকে দারুণ কিছু স্মৃতি, ছোট্ট কিছু মুগ্ধতা, এই মুগ্ধতার রেশ গুলো আমাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করে।

গল্পের শেষটায় আমরা বরং আশা করতে পারি সাকিব এবং মেঘলীনা যার যার জীবনে ভাল আছে।

আরও জানতে পড়তে পারেন ভাঙ্গনের গান, বড় প্রেম শুধু কাছেই টানেনা দূরেও সরিয়ে দেয়

Leave a Reply

%d bloggers like this: